বলা হয়, মোল্লা ছিলেন তুরস্কের আকশেহরের বাসিন্দা। বিভিন্ন ধরণের মজার গল্পের সঙ্গে নাসিরুদ্দিন মোল্লার নাম জড়িয়ে আছে বহুকাল ধরেই। এখনো সেই ধারা চলে আসছে। নাসিরুদ্দিনের প্রতিটি গল্পই দুর্দান্ত বুদ্ধিদীপ্ত। গল্পের কোথাও নাসিরুদ্দিন অত্যন্ত বোকা। আবার কোথাও প্রচন্ড চালাক। চালাক বোকা যাই হোন না কেন নাসিরুদ্দিনের প্রতিটা গল্পেই কোন না কোন সামাজিক বার্তা থাকে। প্রতিটি গল্পই নাসিরুদ্দিনের ব্যাঙ্গাত্মক মন্তব্যের মাধ্যমেই শেষ হয়। পৃথিবীতে নাসিরুদ্দিন মোল্লার মজার গল্পগুলো ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছে। এমনকি ইউরোপ ও আমেরিকাতেও নাসিরুদ্দিন মোল্লার গল্প জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। আফ্রিকাতে নাসিরুদ্দিনের গল্পের জনপ্রিয়তা আছে। আমার এই ব্লগে পাঠকরা তারও কিছু প্রতিচ্ছবি দেখতে পারবেন। আগেই বলেছি নাসিরুদ্দিনের গল্পগুলো বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে। এছাড়াও গল্পগুলোতে মজার ছলে দার্শনিক বার্তাও থাকে।
অনুমান করা হয় নাসিরুদ্দিনের গল্পগুলি তৈরি হয়েছিল প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ বছর আগে। এর থেকেই আন্দাজ করা হয় মোল্লার চরিত্রটিও প্রায় ৮০০ বছরের পুরোন। অনেকে বলেন তুর্কি পন্ডিত বা হোজা বা হোজ্জাদের নানারকম ছোটোখাট গল্প বা ঘটনাগুলোকে সম্মিলিত ভাবে মোল্লার গল্প বলে চালানো হয়েছে। আদৌ মোল্লা নাসিরুদ্দিন নামের কোন লোকের অস্তিত্বই ছিলনা! কিন্তু এই ‘অস্তিত্বহীন’ মোল্লাকে নানা দেশে নানা নামে ডাকা হয়। আজারবাইজানি, আফগানি, ইরানি, পাকিস্তানি, ভারতীয় এবং মধ্য এশিয়ার অনেক দেশেই ‘মোল্লা নাসিরুদ্দিন’ নামে তিনি খ্যাত। ‘খোজা নাসিরুদ্দিন’ বলেন কাজাখাস্তানিরা। গ্রিসে ‘হোজা নাসিরুদ্দিন’ নামে তাঁকে ডাকা হয়। তুরস্কে ডাকা হয় ‘নাসিরুদ্দিন হোকা’ বলে। আরবে, মধ্য প্রাচ্যে উত্তর আফ্রিকায় তাঁকে ‘জুহা’ বলা হয়। তাঁর নামের বানানের অপভ্রংশ অনেকটা এই ধরণের – ‘নাসরুদ্দিন’, ‘নাসের উদ দিন’, ‘নাস্র আল দিন’, ‘নাসরেদ দিন’ ইত্যাদি। তাঁর জনপ্রিয়তা উর্ধগামী। ১৯৯৬ সালে বিশ্বময় নাসিরুদ্দিন বৎসর পালন করা হয়েছে। এই ‘অস্তিত্বহীন’ মোল্লার সমাধিও আছে আকশেহরে।
মোল্লা কিছু বলো
জুম্মার নামাজের পর নামাজিরা মোল্লাকে ছেঁকে ধরল। মোল্লা তোমাকে কিছু বলতে হবে। তুমি আমাদের কিছু জ্ঞানের কথা শোনাও। মোল্লা আবার কি বলবে! মোল্লা বলল, আমি বাপু অতশত জানিনা। আমি বলতে পারবনা। নাছোড়বান্দা সবাই। মোল্লা এইবার ভেবেটেবে বলতে উঠল।
“বন্ধুগণ, প্যায়ারে দোস্তো, আমি যা বলতে চাইছি আপনারা নিশ্চয়ই তা বুঝতে পারছেন।”
লোকেরা ভ্যাবাচ্যাকা। মোল্লা কিছু বলতে চাইছে। মোল্লা কি বলে দেখাই যাক। লোকেরা মশকরা করে বলল, “না না আমরা জানিনা আপনি কি বলতে চাইছেন, বলুন, বলুন, আপনি কিছু বলুন।”
মোল্লা তখন বলল, “জানেনই না যখন, তখন আর জেনে কী হবে? আমি চলি ভাই।” এই বলে মোল্লা গটগট করে হেঁটে বেরিয়ে গেল। লোকেরা ভাবল, আচ্ছা বোকা বানাল তো মোল্লা।
পরের জুম্মায় আবার মোল্লাক আটকে নামাজিরা বলল, “মোল্লা, আপনাকে কিছু বলতে হবে। আগের বার আমাদের বোকা বানিয়ে আপনি চলে গেছেন। এবারে ছাড়ছিনা। কিছু বলতেই হবে মোল্লা।”
মোল্লা সাতপাঁচ না ভেবে ভিড়ের মধ্যে জোরে জোরে বলতে বলতে লোকেদের সামনে এগিয়ে এল, “আমি আজ আপনাদের বলতে চাই তা আপনারা কি জানেন?”
লোকেরা চালাকি করে বলল “জি মোল্লা সাহেব, আমরা সবাই জানি আপনি কি বলবেন। এবার বলুন।”
মোল্লা ঝট করে উত্তর দিল, “জানেনই যখন, তখন আর আমার বলার দরকার কী?”
এই কথা বলে মোল্লা আবার গটগট করে হেঁটে ভিড় ঠেলে কেটে পড়ল।
লোকেরা মোল্লার এই চালাকি দেখে আরও জেদে পড়ে গেল। পরের জুম্মায় আবার মোল্লাকে ধরল কিছু বলানোর জন্যে। মোল্লা এবার আর ভ্যানতাড়া না কষে বলল, “আমি কি বলতে চাই আপনারা নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন।” সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকেরা বলল, “না না, আমরা জানি না আপনি কি বলতে চাইছেন।” আবার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকেরা বলল, “না না, আমরা জানিনা আপনি কি বলবেন, তাই আপনি বলুন আমরা শুনি।” লোকেরা ভাবল, এবার মোল্লাকে বাগে পাওয়া গেছে। মোল্লা তো বলতেই জানেনা। এবার কি বলে দেখা যাক।
মোল্লা আর ক্ষণিক সময় নষ্ট না করে বলল, “তাহলে তো ভালই হল। যারা জানেন তাঁরা যারা জানেন না তাঁদের জানিয়ে দিন। আমি তবে চলি।”
গাধা পিটিয়ে মানুষ করা
বাদশাহ একবার একটা গাধা কিনেছেন। গাধাটার যত্নের ত্রুটি নেই। মোল্লা নাসিরুদ্দিনকে ডাকা হল গাধা দেখবার জন্য। যথারীতি বাদশাহকে খুশী করবার জন্য মোল্লা গাধার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। গাধার জয়গান গাইতে গাইতে মোল্লা বাদশাহকে পরামর্শ দিল, "হুজুর, গাধাটি কিন্তু খুবই মেধাবী হবে বলে মনে হচ্ছে। লেখাপড়া শেখাতে পারলে এই গাধাই একদিন আপনার সভা আলোকিত করতে পারবে।"
এতটা বলার দরকার ছিলনা। মোল্লা মশকরা করার লোভ সামলাতে পারতনা। বাদশাহ তাঁর সভায় গাধা পারিষদের আগমনী বার্তা শুনে মনে মনে বেজায় চটলেন। কিন্তু প্রকাশ করলেন না। বাদশাহ আবার মোল্লাকে অপদস্থ করতে পারলে বেজায় খুশি হতেন। বাদশাহ বললেন, “ভালই হল মোল্লা, তোমাকে দুমাস সময় দিলাম। তুমি ওকে লেখাপড়া শিখিয়ে দাও।” মোল্লাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই তিনি সিপাই পাঠিয়ে মোল্লার উঠোনে গাধাটাকে বেঁধে দিতে বললেন।
দু’মাস পরে মোল্লা নাসিরুদ্দিন গাধার পিঠে চেপে বাদশাহের দরবারে হাজির। গাধার পিঠে নাসিরুদ্দিন আর নাসিরুদ্দিনের মাথায় ঢাউশ একটা বই। নগরবাসী হাজির। ভিড় উপচে পড়ছে। মোল্লা আর গাধা কথা বলবে। অজব বাত। গজব বাত। বাদশাহ আদেশ দিলেন, “মোল্লা, এইবার দেখাও আমার গাধা কেমন লেখাপড়া শিখল!”
মোল্লা বাদশাহের সামনে এসে মাথা থেকে ধপ করে বইটা মাটিতে ফেলে গাধার পিঠ থেকে নেমে বাদশাহকে সেলাম ঠুকে বাধশাহের সামনে বইটাকে রেখে গাধার লেজে একটা মোচড় দিতেই গাধাটা টুকটুক করে হেঁটে বাদশাহের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জিভ দিয়ে বইয়ের একটা পাতা ওল্টালো। তারপর আরেকটা পাতা। তারপর আরেকটা। এইভাবে পরের পর সব পাতা ঊল্টে দিয়ে গাধাটা বাদশাহের দিকে চেয়ে বিশাল এক হাঁক পাড়ল। মোল্লা বলল, “হুজুর গাধাটা বই পড়ে আপনাকে সেলাম করতে শিখেছে।”
গাধার এইসব কান্ডকারখানা দেখে সভার লোকেরা অবাক। গাধাটা পড়তে শিখে গেছে! গড়গড় করে হাততালি পড়তে শুরু করল। বাদশাহও অবাক হয়ে মোল্লাকে সাবাশি দিয়ে বললেন। “মোল্লা, এই অসম্ভব কাজ কি করে করলে?”
মোল্লা নাসিরুদ্দিন বলল, “হুজুর, এটা আপনার কেনা গাধা বলেই সম্ভব হল। তাহলে কিভাবে লেখাপড়া শেখালাম শুনুন। প্রথম দিন বইয়ের ওপরে খড় রেখে গাধাটার লেজ টানলাম। গাধাটা সুড়সুড় করে এসে খড় খেয়ে ফেলল। গাধাটা বই দেখে আগ্রহ পেল। পরের দিন বইয়ের প্রথম পাতায় খড় রাখলাম। গাধাটা মলাট উলটে খড় খেল। তারপরের দিন তারপরের পাতায়। গাধাটা তারপরের পাতা জিভ দিয়ে উলটে খড় খেল। এইভাবে দিন বদলাল। খড়ের পাতাও বদলাল। গাধাটা জিভ দিয়ে এইভাবে পাতার পর পাতা উলটে খড় খেতে শুরু করল। এইভাবে খড় খেতে খেতে বই পড়া শিখে গেল। শেষের পাতায় খড় রাখলেই গাধাটা প্রথম পাতা থেকে পাতা উলটে খড় খোঁজা শুরু করত। বইয়ের সব কটা পাতা উল্টে একেবারে শেষের পাতায় রাখা খড় খেত। এইভাবেই চলতে লাগল। একমাস পরেই ব্যাপারটা সড়গড় করে ফেলল গাধাটা। মেধাবী গাধা তো। আজ আর কোথাও খড় দিইনি। তাই বই পড়া শেষ করে খড় না পেয়ে গাধার স্বরে আপনাকে সেলাম করে বলল খানিকটা খড় দিতে।”
মোসাহেবি
মোল্লা বাদশাহের দরবারে মোসাহেবি করতেন। দরবারে তাঁর খুব নামডাকও ছিল। সমঝদার মোসাহেব হিসেবে বাদশাহের দরবারে মোল্লার খাতিরও কম ছিলনা।
একদিন বেগুন ভাজা খেতে খেতে বেজায় খুশি হয়ে বাদশাহ নাসিরুদ্দিনকে বললেন, "বেগুনের মতো এমন সুস্বাদু খাদ্য আর কিছু তোমার জানা আছে কি ?"
“না হুজুর, বেগুনের মতো আর কোন জিনিস হয় না।"
শাহেনশাহ হুকুম দিলেন, " এবার থেকে আমার রোজ বেগুন ভাজা চাই।”
তারপর রোজ রোজ দু'বেলা বেগুন ভাজা খেতে খেতে মুখ পচিয়ে একদিন বাদশাহ হঠাৎ রেগেই গেলেন। খানসামাকে ডেকে বললেন, " আজ থেকে কোন দিন আর বেগুন ভাজা খাব না। বেগুনের কোন গুণ নেই। এসব অখাদ্য কুখাদ্য আমাকে আর দিবিনা।"
“বেগুন একেবারে অখাদ্য।” মোল্লা সায় দিলেন প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই।
বাদশাহ এ কথা শুনে অবাক হয়ে বললেন, " সে কি মোল্লা সাহেব, তুমি যে এই সেদিনই বললে, “গুনের মতো আর কোন জিনিস নেই! “
"আমি তো আপনার মোসাহেব, জাঁহাপনা", বললেন নাসিরুদ্দিন, "বেগুনের তো নই।"
মোল্লার এ কথা শুনে বাদশাহ খুশি হয়ে মোল্লাকে স্বর্ণমূদ্রা বকশিশ দিলেন।
ধারে গাধা
একজন প্রতিবেশি এসে মোল্লা নাসিরুদ্দিনকে বলল, “মোল্লা, আপনার গাধাটা ধার দেবেন। একটু বাইরে যাওয়া প্রয়োজন ছিল।” মোল্লা বললেন, “দুঃখিত ভাই, আজ আর গাধাটা ধার দিতে পারলাম না। আজ ওটা আরেকজনকে ধার দিয়েছি।” এমন সময়ে বাড়ির উঠোন থেকে মোল্লার গাধাটা ডেকে উঠল। লোকটা বলল, “ওই তো গাধা বাড়িতেই আছে।” মোল্লা বললেন, “যে আমার কথার চেয়ে গাধার কথা বেশি বিশ্বাস করে তাকে ধার দেয়া যায় না।”
টাকার গন্ধ
একদিন মোল্লা এক মিষ্টির দোকানের পাশ দিয়ে যেতে যেতে দোকানের থরে থরে সাজানো সুগন্ধি মিষ্টির দিকে চেয়ে মিষ্টি কিনতে না পেরে গন্ধ শুঁকেই আদ্ধেক পেট ভরিয়ে দোকানিকে ধন্যবাদ দিতে গেলেই দোকানি মোল্লার কাছে পয়সা চেয়ে বসল। মোল্লা তো ভ্যাবাচ্যাকা। একি কান্ড! ভাল লোকের দিন শেষ হয়ে গেছে নাকি!
বচসা না করে দোকানির পয়সা মিটিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
পরের দিন। সেই মিষ্টির দোকানে এসে মোল্লা পেট পুরে মিষ্টি খেলেন। গান্ডেপিন্ডে গিলে মোল্লা দোকানির সামনে এসে দাঁড়ালেই দোকানি মিষ্টির দাম চাইল। মোল্লা তার জোব্বা থেকে একটা মূদ্রার থলি বের করে থলিটা আচ্ছা করে ঝনঝন শব্দ করে নাড়াতে নাড়াতে বললেন, টাকার ঝনঝন ঝঙ্কার শুনতে পাচ্ছেন কি?
দোকানি বলল, হ্যাঁ পাচ্ছি।
মোল্লা বললেন, তাহলে তো ভালই। মিষ্টির গন্ধ শুঁকলে যখন পয়সা দিতে হয় তখন পয়সার শব্দ শুনেই মিষ্টির দাম বুঝে নিন ভাই। আমি চললাম। এই বলে পয়সা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে মোল্লা দোকান ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
দুটো প্রশ্নের দাম পাঁচ টাকা
মোল্লা একদিন তাঁর দরজায় একটা নোটিশ টাঙিয়ে দিলেন, দুটো প্রশ্নের দাম পাঁচ টাকা। যে কোন দুটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হবে। মাত্র পাঁচ টাকা লাগবে।
পাড়ার এক মুরুব্বি মোল্লার হাতে পাঁচ টাকা গুঁজে দিয়ে বলল, আমার দুটো প্রশ্ন করার আছে কিন্তু পাঁচ টাকাটা এক বেশি হয়ে যাচ্ছে না কি?
মোল্লা তক্ষুণি জবাব দিল, ঠিক আছে, এবার ঝপ করে দ্বিতীয় প্রশ্নটা করে ফেলুন।
বৃষ্টির মধ্যে দৌড়
খুব জোরে বৃষ্টি পড়ছে একদিন। সেই তুমুল বৃষ্টি মাথায় একটা লোক রাস্তা দিয়ে পাঁইপাঁই করে দৌড়ে যাচ্ছিল। নাসিরুদ্দিন বাসার জানালার ধারে বসে বৃষ্টি দেখছিলেন, লোকটাকে এভাবে দৌড়াতে দেখে থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আরে, এত জোরে দৌড়াচ্ছ কেন?” লোকটি জবাব দিল, “দেখছ না কত জোরে বৃষ্টি হচ্ছে? দৌড়োবনা তো কি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজব?” নাসিরুদ্দিন বললেন, “তুমি তো আচ্ছা লোক হে, আরে বৃষ্টি হল সৃষ্টিকর্তার রহমত। আর তা অবহেলা করে তুমি এভাবে দৌড়াচ্ছ?” একথা শুনে লোকটা লজ্জা পেয়ে গেল। আর না দৌড়িয়ে চুপচাপ হাঁটতে হাঁটতে কাক ভেজা হয়ে ঘরে ফিরল।
অন্য আরেক দিন। তেমনি বৃষ্টি। এবার দৌড়োচ্ছেন মোল্লা আর সেদিনের কাকভেজা লোকটা জ্বর বাধিয়ে বাড়িতে বসে আছে আর বাড়ির জানলা থেকে মুখ গলিয়ে দেখছে মোল্লাকে দৌড়োতে। এবার লোকটা মোল্লাকে থামিয়ে বলল, “কি হে মোল্লা, আজ তুমি যে দৌড়াচ্ছ বড়! সৃষ্টিকর্তার রহমত কেন অবহেলা করছ? ধীরে যাও।" মোল্লা নাসিরুদ্দিনের সুচতুর জবাব, “আরে সে জন্যেই তো এত জোরে দৌড়োচ্ছি। যাতে করে সৃষ্টিকর্তার রহমত খুব বেশী পায়ের নিচে পড়ে অসম্মান না হয়।”
মোল্লার পাগড়ি গোসল
একবার মোল্লা চারদিকে তাপ্পি মারা খুব নোংরা একটা পাগড়ি পরে একটা সরাইয়ে ঢুকেছেন স্নান করতে। বেয়ারা মোল্লাকে নোংরা একটা তোয়ালে আর পচা তেল সাবান দিয়ে ঝুল ধরা পুরোন একটা স্নানঘর দেখিয়ে দিলেন। মোল্লা স্নান করে বেরিয়ে বেয়ারা একটু বেশি বকশিস দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
পরের দিন মোল্লা আবার সেই স্নানঘরে গেলেন স্নান সারতে। এবার নতুন ধোপদুরস্ত কাপড়চোপড়। তার সঙ্গে সুগন্ধি মাখানো পাগড়ি বিশাল মাপের এক পাগড়ি মাথায়। মোল্লাকে দেখেই এবার বেয়ার লম্বা সেলাম ঠুকে নতুন তোয়ালে, দামী আতর সাবান ইত্যাদি দিয়ে ঝকঝকে একটা স্নানঘরে ঢুকিয়ে দিলেন। মোল্লা নিরাপদে গোসল করে আতর মেখে বেরিয়ে এসে বেয়ারাকে ডাকলেন। বেয়ার আবার সেলাম ঠুকে দাঁড়াল। এবার পকেট থেকে একটা ফুটো পয়সা বের করে বেয়ারার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এই নাও, কালকেরটা আজকে দিলাম, আজকেরটা কালকেই দিয়ে দিয়েছি।
মোল্লার পাগড়ি
মোল্লার একদিন বড় পাগড়ি পরার শখ হল। যেমনি কথা তেমনি কাজ। মোল্লা পেল্লাই এক ঝুড়ির মতো পাগড়ি মাথায় দিয়ে রাস্তায় বেরোলেন। অতবড় পাগড়ি মাথায় এক লোককে দেখে এক পথচারী হাতে মোড়া একটা চিঠি নিয়ে কাকতি মিনতি করে বলল, হুজুর, আমার এই চিঠিটা পড়ে দিন।
মোল্লা বললেন, আমি মূর্খ। আমি নিরক্ষর। আমি তোমার চিঠি পড়তে পারবনা।
পথচারী ততধিক বিনয়ের সঙ্গে বলল, আপনি খুবই বিনয়ী হুজুর। এত বড় পাগড়ি! আর বলছেন আপনি পড়তে পারেননা! আপনি পন্ডিত নন। আপনি বিনয়ের অবতার।
মোল্লা সঙ্গে সঙ্গে নিজের মাথার পাগড়িটা লোকটার মাথায় পরিয়ে দিয়ে বললেন, ঠিক আছে, পাগড়ির যদি অক্ষর জ্ঞান থাকে তবে এবার তুমিই নিজের চিঠি পড়ে ফেলতে পারবে।
মোল্লার পাগড়ি বিভ্রাট
একবার একজন লোক মোল্লার কাছে একটা চিঠি নিয়ে এসে পড়ে দেওয়ার অনুরোধ করল। মোল্লা পড়ার চেষ্টা করে বিফল হয়ে বলল, “লেখাটা দুষ্পাঠ্য তাই পড়া যাইতেছেনা।”
লোকটা খেপে গিয়ে বলল, “একটা সাধারণ চিঠি পড়তে পারো না আবার মাথায় পাগড়ি পর”।
মোল্লা তাড়াতাড়ি নিজের পাগড়ি খুলে লোকটার মাথায় পরিয়ে দিয়ে বলল, “এই যে ভায়া, এখন তোমার মাথায় পাগড়ি আছে, এইবার তুমি দেখো তো চিঠিটা পড়তে পারছ কিনা?”
মোল্লার পাগড়ির দাম
নাসিরুদ্দিন একদিন মাথায় এক বিচিত্র বাহারের বিশাল পাগড়ি পরে বাদশাহর দরবারে গিয়ে হাজির হলেন।
বাদশাহ মোল্লাকে দেখেই হাসতে হাসতে প্রশ্ন করলেন, “তোমার ওই আশ্চর্য পাগড়িটা কত দিয়ে কিনলে মোল্লা।”
“এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা, শাহেনশাহ।”
বিদঘুটে পাগড়ির এত দাম শুনে এক উজির বাদশাহর কানে কানে ফিসফিস করে বললেন, “মূর্খ না হলে কেউ ওই পাগড়ি অত দাম দিয়ে কিনতে পারে জাঁহাপনা! মোল্লা তো দেখছি একেবারে আকাট মূর্খ হুজুর।”
ওর কথায় কান না দিয়ে বাদশাহ মোল্লাকে বললেন, “অত দাম কেন? একটা পাগড়ির জন্য এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা আমার কাছে অবিশ্বাস্য বলেই মনে হচ্ছে।”
“ভালো লাগাটাই বড়, মূল্যের ব্যাপারটা যারা রসিক তাঁদের কাছে কিছুই না জাঁহাপনা। আর আমি ভালোভাবে জানি, দুনিয়ার কেবল একজন সমঝদার বাদশাহই আছেন, যিনি এই পাগড়ি চিনতে পেরেছেন। আমি জানি এই দুনিয়ায় একমাত্র দিলদার বাদশাহ আছেন যিনি ন্যায্য দাম দিয়ে এই শখের পাগড়ি কিনতে পারেন। আপনি ছাড়া কার এমন দিল আছে, জাঁহাপনা?”
তোষামোদে খুশি হয়ে বাদশাহ তৎক্ষণাৎ মোল্লাকে দুহাজার স্বর্ণমুদ্রার একটা থলি ধরিয়ে নিজেই সেই পাগড়িটা কিনে নিলেন মোল্লা সাহেবের কাছ থেকে।
আড়ালে গিয়ে উজিরকে ডেকে মোল্লা বললেন, “উজির সাহেব, আপনি হয়তো পাগড়ির মূল্ল্যটা বুঝেছিলেন কিন্তু আমার মূল্যটা বোঝেননি। আমার দাম আপনার আগেই জেনে রাখা উচিত ছিল।"
নাসিরুদ্দিনের গিটার বাদন
একবার মসজিদের নামাজ থেকে বেরোনোর পর মোল্লাকে সবাই ঘিরে ধরল। মোল্লাকে গিটার বাজানোর আবদার করে বসল সবাই। মোল্লাও কম যেতেন না। তিনি নিজেই তাঁর গিটার বাজানোর হাতের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন। তিনি বললেন, আমার মতো বাজনদার দুনিয়ায় নেই। আমার গিটার শুনে পাথর গলে যেত। আমার গিটার শুনে নদি পথ পালটে ফেলত। আমার গিটার শুনে বাদশাহের ঘুম ভাঙত। লোকেরা মোল্লার এই বড়াইয়েরই অপেক্ষায় ছিল। তারা সবাই মিলে এবার মোল্লার হাতে তাড়াতাড়ি একটা গিটার ধরিয়ে দিয়ে বলল, এবার বাজাও মিঞা।
মোল্লা গিটারটা নিয়ে একটা তারই বাজাতে শুরু করলেন। অনেকক্ষণ ধরে আঙুল দিয়ে একটা তারেই টিপে টিপে বাজাতে থাকলেন। কোন সুর উঠছেনা দেখে উৎসুক একজন মোল্লাকে জিজ্ঞেস করল, একি মোল্লা তুমি একটা তারই নেড়ে যাচ্ছ? যারা গিটার বাজায় তারা সবকটা তারে আঙুল খোঁচায়। তুমি কেন সবকটা তার বাজাচ্ছ না!
মোল্লা গিটার থামিয়ে বললেন, ওই সব গিটার বাজনদারেরা সুর তাল কিছুই জানেনা। তাই তারা তার খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সুর খোঁজে। আমার ওসব দরকার পড়েনা। আমি যেখানে আঙুল ছোঁইয়াই সেখানেই সুর ওঠে। আমি কেন অন্য তারে গিয়ে বাজাব বলতে পারো?
মোল্লার অভিশাপে কি গোরু মরে?
নাসিরুদ্দিনের বিবি একবার আবদার করলেন যে তাঁর একটা দুধেলা গোরু চাই। দুধেলা গোরু থাকলে রোজ দুধ পনির খোয়া এইসব খাওয়া যাবে। নাসিরুদ্দিন আপত্তি জানিয়ে বললেন, গাধা বেঁধে আমাদের আস্তাবলে আর জায়গা বাঁচেনা যে আরেকটা গোরু রাখব।
কিন্তু বিবি নাছোড়বান্দা। গোরু কিনিয়ে তবে ক্ষান্ত হলেন তিনি।
গাধার পাশে গোরু বাঁধা শুরু হল আস্তাবলে। গাধাটা্র থাকার জায়গা কমে গেল। তার ওপর গোরুটা মাঝে মাঝে গাধাটাকে গুঁতিয়ে দিত। গাধাটা রাতভোর চেঁচাত। নাসিরুদ্দিন এইসব আগেই ভেবেছিলেন। গোরু কিনতে আপত্তিও করেছিলেন। বিবিজানের গোঁসা ঠান্ডা করতে এই গোরু কিনতে হয়েছে। দিন রাত বিরক্ত হতে হতে একদিন রাতে ঈশ্বরকে স্মরণ করে বললেন, হে সৃষ্টিকর্তা, তুমি এই গোরুটাকে তুলে নাও যাতে আমার গাধাটার থাকার জায়গা আবার আগের মতো হয়ে যায়।
পরের দিন ঘুম থেকে উঠে মোল্লার বিবিজান আস্তাবল সাফ করতে গিয়ে দেখেন গাধাটা মরে পড়ে আছে। দৌড়ে গিয়ে মোল্লাকে জানালেন। মোল্লা আবার ঈশ্বরকে স্মরণ করে বললেন, হে সৃষ্টিকর্তা, সবই তো তোমার সৃষ্টি তাও তুমি গাধা আর গোরুতে তফাত বুঝতে পারলেনা!
চালে চাপিয়ে মোল্লার শিক্ষাপ্রদান
একদিন নাসিরুদ্দিন ঘরে চালে উঠে চাল মেরামত করছিলেন। এমন সময়ে নিচের সদর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। নাসিরুদ্দিন হাঁক পেড়ে বললেন, কি চাই এখানে?
লোকটা নিচে থেকে বলল, মোল্লা তুমি একটু নিচে নেমে এসো, একটা জরুরি কথা বলার ছিল।
কাজে ব্যাঘাত হবে বলে ইচ্ছে না থাকলেও মোল্লা জরুরি কথা শুনতে নিচে নেমে এসে বললেন, বলো ভাইজান, তোমার সেই জরুরি কথাটা।
লোকটা পাশের আরেকটা দাঁড়িয়ে থাকা লোককে দেখিয়ে বলল, দেখ মোল্লা এই লোকটা খুবই গরিব। তুমি একে রুটি কিনতে পাঁচটাকা দিতে চাও?
মোল্লা গম্ভীর হয়ে খানিকক্ষণ চিন্তার ভান করে লোকটাকে বললেন, আমি উত্তর দেব, তার আগে আপনাকে একবার সিঁড়ি বেয়ে ঘরের চালে চাপতে হবে যে।
লোকটা নড়বড়ে সিঁড়ি বেয়ে কষ্ট করে ঘরের চালে চেপে গেল। লোকটাকে চালে চাপিয়ে মোল্লা নিচে থেকেই চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বললেন, ভায়া এবার তবে আমার উত্তর শোন। তোমার আবদার আমি রাখতে পারলাম না। এবার নেমে এসো।
পড়শি আর নধর খাসি
নাসিরুদ্দিন মোল্লা একবার খুব যত্ন করে একটা খাসি পুষেছিলেন। নধরকান্তি খাসিটার ওপর পাড়াপড়শির অনেকদিন ধরেই লোভ ছিল। একদিন কয়েকজন পড়শি যুক্তি করে দল বেঁধে হানা দিল মোল্লার বাড়িতে। মোল্লাকে ডেকে বলল, “শুনেছ কি মোল্লা! আমাদের সবার জন্যে বড়ই দুঃসংবাদ আছে। এত শখের গাছপালা, বাড়িঘর, সহায়সম্পত্তি, তোমার প্রিয় গাধা, এমনকি তোমার এই নধর খাসিটাও আর থাকবেনা।সব শেষ হয়ে যাবে। বুঝলে মোল্লা।”
মোল্লা অবাক হয়ে চেয়ে বললেন। “তবে এখন উপায়?”
“আর কোন উপায় নেই মোল্লা। তার চেয়ে বরং যে কটা দিন বেঁচে থাকব একটু আয়েশ করে বাঁচি। তোমার খাসিটাও তো মরবে। চলো আজ আমরা তোমার খাসিটাকে জবাই করে ওটার মাংস খেয়ে সবাই মিলে আয়েশ করি।”
মোল্লাও রাজি হয়ে গেলেন। সবাই মিলে খাসি জবাই করে মহানন্দে রান্না করে পেটপুরে মাংস খেয়ে জামা জোব্বা পাগড়ি খুলে সবাই মোল্লার বাড়িতেই রাতের বেলা ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে উঠে সবাই দেখে তাদের জামা জুতো জোব্বা পাগড়ি আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা।
মোল্লা ওদের জামা জোব্বা খুঁজতে দেখে বললেন, আর খুঁজে কি হবে ভাই! কাল তোমরা ঘুমিয়ে যাওয়ার পর ভাবলাম দুনিয়া তো ধ্বংস হয়েই যাবে তবে এইসব জামা জুতো জোব্বা পাগড়ি রেখে আর কি লাভ। তাই পুড়িয়ে ফেললাম।”
এবার মোল্লার পাল্লায় দার্শনিক
একবার এক বিখ্যাত পন্ডিত ও দার্শনিক আকশেহরে এসে গাধার পিঠে মোল্লাকে দেখতে পেয়ে বললেন, “মোল্লা সাহেব, আমি অন্য শহরের লোক, আমার ক্ষিদে পেয়েছে কিন্তু আশেপাশের কোন খাবারের ভাল দোকানের সন্ধান দাও।”
মোল্লা একটা দোকানের সন্ধান দিয়ে দিলেন।
দার্শনিক খুশি হয়ে বললেন, “মোল্লা তুমিও চলো তাহলে। আমার সঙ্গে কিছু খেয়ে নেবে।”
মোল্লা গদগদ হয়ে দার্শনিককে নিয়ে নামী একটা সরাইখানাতে গিয়ে বেয়ারাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল আজকের স্পেশাল মেনু কি!
বেয়ারা জবাব দিল, “মাছ। তাজা ভাজা মাছ। টাটকা মাছ। চলবে?”
দার্শনিক বললনে, “ঠিক আছে। আমাদের জন্যে দুটো মাছভাজা দাও।”
কিছুক্ষণ পরে বেয়ারাটা একটা থালায় দুটো মাছ নিয়ে হাজির হল। থালায় একটা মাছ বড় ছিল। অন্য একটা মাছ ছোট। মোল্লা বড় মাছটা নিয়ে নিজের পাতে রাখল। তার ওপর নুন লেবু ঘষে কাঁচা পেঁয়াজ ছড়িয়ে খাবার জন্যে রেডি করে রাখছিল। মোল্লার এই স্বার্থপরতা দেখে দার্শনিক তাঁর জ্ঞানভান্ডার আর সামলে রাখতে না পেরে জীবনের মূল্যবোধ, স্বার্থপরতা, লোভ, অতিথি সৎকার, অবিশ্বাস ইত্যাদি সম্বন্ধে বিষদ জ্ঞান দিতে প্রায় ক্লান্ত হয়ে গেছেন দেখে মোল্লা বললেন, “আপনার কি আরও কিছু বলার আছে?”
দার্শনিক বললেন, “না, কি আর বলব! তবে আমি হলে ছোট মাছটা নিয়ে নিজের উদারতার পরিচয় দিতাম।”
মোল্লা সঙ্গে সঙ্গে প্লেট থেকে ছোট মাছটা উঠিয়ে দার্শনিকের থালায় নামিয়ে দিতে দিতে বললেন, “আমিও সেটাই ভেবেছিলাম। তাই ছোট মাছটা আপনার জন্যেই রেখে দিয়েছিলাম।”
গাধার পিঠে উলটো বসে মোল্লা
মোল্লা একবার গাধার পিঠে উলটো হয়ে বসে যাচ্ছিলেন। পাড়ার লোকেরা মোল্লাকে দেখে জোরে জোরে বলল, “আরে মোল্লা, তুমি উলটো হয়ে বসেছ কেন?”
মোল্লা জবাব দিল, না রে ভায়া না। আমি ঠিকঠাক বসেছি। আমার গাধাটা উলটো দিকে চলছে।”
পরের দিন আবার মোল্লা গাধার পিঠে। এবার গাধা যেদিকে যাচ্ছে মোল্লা সেইদিকে মুখ করে বসেছেন। পাড়ার লোকেরা মোল্লাকে দেখে মশকরা করে বলল, “আরে! কি ব্যাপার মোল্লা। আজ দেখছি তোমার গাধাটা উলটো দিকে যাচ্ছে!”
মোল্লা বলল, “মোটেই না। আজ আমি তো সোজা আছিই। যেমন কালকে ছিলাম। আজ আমার গাধাটাও সোজা আছে। এ তোমাদের দেখার ভূল। তাই কোনদিন আমাকে উলটো দেখ আর কোনদিন গাধাকে।”
মোল্লা আর কম্পাসের গল্প
গ্রামের একজন একদিন একটা কম্পাস হাতে নিয়ে মোল্লার কাছে হাজির। লোকটা মোল্লার কাছে জানতে চাইল এই বস্তুটা কি!
কম্পাসটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভাল করে দেখলেন মোল্লা। তারপর কম্পাসটা সেই লোকটার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে হাউ হাউ করে খানিকক্ষণ কেঁদে নিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে কান্না থামিয়ে হাহা করে খানিকটা হেসে নিলেন। লোকটা তো এইসব দেখে তাজ্জব। তাড়াতাড়ি কম্পাসটা মাটিতে ফেলে একটু দূরে সরে দাঁড়িয়ে মোল্লাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ব্যাপারটা কি হল মোল্লা! তুমি কাঁদলে, এখন আবার তুমি হাসছ!”
মোল্লা বললেন, “আমি কাঁদলাম কারণ এত ছোট্ট জিনিসটা ঠিক কি, তা তুমি বুঝে উঠতে পারোনি বলে। আর আমি হাসলাম কারণ এই ছোট জিনিসটা কি তা আমিও জানিনা বলে।”
কিপটের জলে পড়ার গল্প
মোল্লা একদিন যেতে যেতে দেখলেন রাস্তার ধারের পুকুরে লোকে ভীড় করে দাঁড়িয়ে হাড়কিপটে বদরুদ্দিনকে পুকুরের জল থেকে তোলার চেষ্টা করছে। বদরুদ্দিন সোনার দোকানি। তেমনি কিপটে। পুকুরের ধারের রাস্তা ধরে যেতে যেতে আনমনা হয়ে পা পিছলে পুকুরে পড়েছে। লোকেরা পুকুর ধার পর্যন্ত নেমে এসে বদরুকে ধরার জন্যে হাত বাড়িয়ে চেঁচাচ্ছে, “তোমার হাতটা দাও মিঞা। তোমার হাতটা দাও।”
মোল্লা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন বদরুদ্দিন কিছুতেই হাতটা বাড়াচ্ছেনা। পুকুরের জলেই খাবি খাচ্ছে। এবার মোল্লা পুকুরের ধারে নেমে এসে সবাইকে সরিয়ে দিয়ে বদরুর দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, “এই নাও, আমার হাতটা নাও।”
বলা মাত্রই কাজ হল। বদরুদ্দিন নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল মোল্লার দিকে। মোল্লা অতি সহজেই হাড়কিপটে বদরুদ্দিন খোজাকে জল থেকে টেনে তুলে ফেললেন।
লোকেরা তো অবাক। মোল্লা কি ম্যাজিক জানে নাকি!
মোল্লা বললেন, “ম্যাজিক তো জানিনা কিন্তু বদরু যে কিপটে তা জানতাম। ও কিছু দিতে জানেনা। ও শুধু নিতে জানে। তোমরা ওর হাত চাইলে তাই ও দিলনা। আর আমি ওকে আমার হাত নিতে বললাম আর ও নিয়ে নিল।”
সসপ্যানের বাচ্চা প্রস্রব
একবার এক পড়শির কাছ থেকে একটা সসপ্যান চেয়ে নিয়ে এলেন মোল্লা। কিছুদিন পর মোল্লা সেটা পড়শিকে ফিরিয়ে দিতে পড়শির বাড়িতে গেলেন। পড়শি মোল্লার হাতে তার সেই ঢাকনা দেওয়া সসপ্যান দেখে সেটা নিয়ে ঢাকনা খুলতেই দেখেন ভেতরে একটা তার চেয়ে ছোট সসপ্যান। লোকটা মোল্লাকে বলল, “মোল্লা, মনে হচ্ছে ভুল করে তোমার বাড়ির একটা সসপ্যান এর মধ্যে চলে এসেছে।”
মোল্লা অতি বিনয়ের সঙ্গে জবাব দিলেন, “না ভাই না। তোমার সসপ্যানটা আমার বাড়িতে গিয়ে একটা বাচ্চা সসপ্যানের জন্ম দিয়েছে। সেইটাই এইটা। এটা তোমারই প্রাপ্য।”
পড়শি খুব খুশি হয়ে দুটো সসপ্যান নিয়ে নিলেন।
তার কিছুদিন পর মোল্লা আবার পড়শির কাছ থেকে সেই সসপ্যানটা ধার নিয়ে এলেন। তারপর বেশ কয়েক মাস কেটে গেলে পড়শি মোল্লার বাড়ি এসে তার ধার দেওয়া সসপ্যানটা ফেরত চাইল।
মোল্লা বললেন্, “আর কি বলি ভায়া, তোমার সসপ্যানটাকে বাঁচাতে পারলাম না। মরে গেল। এই খবর লজ্জায় তোমাকে দিতেও পারিনি।”
লোকটা বলল, “তাই কি হয় নাকি গো! সসপ্যান কি মানুষ নাকি যে মরে যাবে?”
মোল্লা জবাব দিলেন, “যে সসপ্যান বাচ্চার জন্ম দিতে পারে সেই সসপ্যান মরে গেলে বিশ্বাস হয়না বুঝি!”
মোল্লার খোঁজে
একবার একজন ভিনদেশি মোল্লার খোঁজ করতে করতে আকশেহরে শহরে এসে হাজির। ভিনদেশি লোকটা দেখতে পেল একজন লোক দেওয়ালে হেলান দিয়ে কিছু চিন্তা করছে। শুনশান এলাকায় আর কাউকে না পেয়ে এই লোকটাকে সে ভিনদেশি জিজ্ঞাসা করল যে মোল্লার বাড়ি কোথায়।
দেওয়ালে হেলান দেওয়া লোকটা বলল, ঠিক আছে, আমি মোল্লাকে খুঁজে নিয়ে আসছি। আমি না আসা পর্যন্ত তুমি দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো। সাবধান কিন্তু, পিঠ সরালেই দেওয়াল পড়ে যাবে।” এই বলে লোকটা মোল্লাকে খুঁজতে চলে গেল। বেশ কয়েক ঘন্টা কেটে গেল।। লোকটা আর ফিরে এলনা।
আকশেহরের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে এরকম এক ভিনদেশি লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে উৎসাহী আর কৌতূহলী বেশ কিছু পথচারী জড়ো হয়ে গিয়েছিল। ভিনদেশি লোকটা এবার ভিড় দেখে বলল তার ঠকে যাওয়ার কথা। শহরের লোক তো হেসেই খুন।
ভিনদেশি জিজ্ঞাসা করল হাসার কারণ!
লোকেরা বল, “আরে বাপু ওই লোকটাই তো সেই লোকটা যার সঙ্গে তুমি এখানে পরিচয় করতে এসেছো।
পাগড়িটা কার?
মোল্লা একবার তার এক নতুন বন্ধুকে আকশেহর ঘুরে যেতে নেমন্তন্ন করলেন। বন্ধু এসে হাজির। মোল্লা তাঁর বন্ধুর সঙ্গে শহরের লোকজনদের পরিচয় করাবেন বলে সেজেগুজে পাগড়ি পরে বন্ধুকে নিয়ে বের হলেন।
“চলো,” নাসিরুদ্দিন বললেন, “আজ আমার কিছু পরিচিত বন্ধুর সঙ্গে তোমার তোমার পরিচয় করিয়ে দিই।”
বন্ধু বলল, “ঠিক আছে চলো। কিন্তু তোমার মতো একটা পাগড়ি আমাকেও দাও। আমিও তোমার মতো পাগড়ি পরব।”
বন্ধুর বায়না থামাতে মোল্লা তাঁর একমাত্র পাগড়ি বন্ধুর মাথায় চাপিয়ে দিয়ে বন্ধুর সঙ্গে বেরিয়ে অন্য আরেক বন্ধুর বাড়িতে গেলেন। বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর পরিচয় করাতে গিয়ে মোল্লা বললেন, “ইনি হলেন বদরুদ্দিন হোজা। ইনি পাশের শহরে থাকেন। ইন্তি আমার বাড়িতে এসেছেন ঘুরতে। ইনি যে পাগড়িটা পরে আছেন সেটা আমার।”
বদুরুদ্দিন যারপরনাই বিরক্ত হল। বন্ধুর বাড়ি থেকে রাস্তায় বেরিয়ে বদুরুদ্দিন বলল, “তুমি কেন বললে যে পাগড়িটা তোমার? এরপর থেকে আর তুমি দয়া করে পাগড়িটা যে তোমার সেটা বলো না।”
কিঞ্ছুক্ষণ পরে অন্য আরেক বন্ধুর বাড়ি মোল্লা তাঁর নতুন বন্ধুকে নিয়ে হাজির। বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় করাতে গিয়ে মোল্লা বললেন, ““ইনি হলেন বদরুদ্দিন হোজা। ইনি পাশের শহরে থাকেন। ইন্তি আমার বাড়িতে এসেছেন ঘুরতে। ইনি যে পাগড়িটা পরে আছেন সেটা কিন্তু আমার না।”
যথারীতি, বন্ধুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে মোল্লার নতুন বন্ধু বদুরুদ্দিন এবার খুবই বিরক্ত হয়ে বললেন, “মোল্লা, তুমি কথায় কথায় খালি পাগড়ি টানছো কেন! এই কথাটা কি বলার খুবই প্রয়োজন ছিল যে পাগড়িটা কার? দয়া করে এইসব বলো না।”
কিছুক্ষণ পর মোল্লা আরেক বন্ধুর বাড়িতে ঢুকলেন তাঁর নতুন বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে। মোল্লা বললেন, ““ইনি হলেন বদরুদ্দিন হোজা। ইনি পাশের শহরে থাকেন। ইন্তি আমার বাড়িতে এসেছেন ঘুরতে। আর পাগড়িটা যে কার সে বিষয়ে আমার কিছুই বলার নেই। পাগড়িটা যারই হোক এ বিষয়ে আমি কিছু বলছিনা।”
মোল্লাকে ধার দেয়না কেউ
একদিন অন্য এক শহরে নাসিরুদ্দিন মোল্লা এক অজানা পথচারীর সঙ্গে আড্ডা জমিয়ে ছি্লেন। গল্প করতে করতে মোল্লা তাকে জিজ্ঞেস করল, “আপনার ধান্দাপানি ভাল চলছে তো।”
লোকটা খুশি হয়ে উত্তর দিল, “তা আপনাদের দোয়ায় ভালই চলছে।”
“ঠিক আছে। ঠিক আছে। আরো দোয়া দেওয়া যাবে। আপনার কাছে কি একশো মোহর ধার পাওয়া যাবে?”
লোকটা এবার গম্ভীর হয়ে বলল, “আপনাকে তো আমি চিনিই না। আপনাকে ধার আমি দিই কি করে?”
“এইটাই তো জ্বালা,” নাসিরুদ্দিন উত্তর দিলেন, “আমাদের শহরে আমাকে কেউ ধার দিতে চায়না কারণ তারা সবাই আমাকে চেনে। আর তোমাদের শহরে তোমরা আমাকে ধার দিতে পারছনা কারণ তোমরা আমাকে চেনোনা।”
নাসিরুদ্দিনের বন্ধুবিরহ
নাসিরুদ্দিনের এক বন্ধু আকশেহর থেকে উঠে অন্য এক শহরে যাওয়ার আগে মোল্লার সঙ্গে দেখা করতে এসে বলল, “মোল্লা, আমি চিরকালের জন্যে এই শহর ছেড়ে চললাম। যাওয়ার আগে তোমার একটা স্মৃতি নিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। তুমি যদি তোমার আঙুলের ওই আংটিটা আমাকে দাও, তবে চিরকাল তুমি আমার চোখের সামনেই থাকবে!”
“হুম,” নাসিরুদ্দিন জবাব দিলেন, “তোমার কাছ থেকে আংটিটা হারিয়ে গেলে বা চুরি হয়ে গেলে তাহলে তুমি আমাকে ভুলে যেতে পার। তার চেয়ে বরং আমি তোমাকে এই আংটিটা দিচ্ছিনা। এর ফলে তুমি যতবার তোমার শূন্য আঙুলের দিকে চাইবে ততবার আমাকে মনে রাখতে পারবে। হারিয়ে যাওয়ার আর চুরি হওয়ার ভয় থাকলনা। তাই তোমার কাছে আমি চিরকাল স্মৃতি হয়ে থাকতে পারব।”
মোল্লা ঘুমোচ্ছে
নাসিরুদ্দিন মোল্লা খুঁটিতে গাধাটাকে বেঁধে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম করছে। ঠান্ডা হাওয়ায় ক্লান্ত চোখ বুজে এসেছে। এমন সময়ে তার ভাইপো এসে মোল্লাকে জিজ্ঞাসা করল, “চাচা, তুমি কি ঘুমোচ্ছ?”
মোল্লা আধবোজা চোখেই জবাব দিলেন, “কেন জিজ্ঞাসা করছিস রে?”
“চাচা, আমি তোমার কাছ থেকে তোমার গাধাটা দুঘন্টার জন্যে ধার নিতাম।”
“ঠিক আছে, বুঝলাম, বুঝলাম। তোর প্রথম প্রশ্নটা কি যেন ছিল?”
ভাইপো বলল, “প্রথমে আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম তুমি ঘুমোচ্ছ কিনা!”
মোল্লা বললেন। তুই ঠিকই ধরেছিস। তখন আমি ঘুমোচ্ছিলাম। আর এখনও আমি ঘুমোচ্ছি।”
গাছের ডাল থেকে মোল্লার লোক নামানো
একবার একটা লোক একটা উঁচু গাছের মগডালে চেপে আর নামতে পারছেনা। যেভাবে উঠেছিল সেইভাবে নামতে গিয়ে দেখে পা হড়কাচ্ছে। লোকটা ভয় পেয়ে আর নামতেই পারছেনা। যতবারই নামতে যায় ততবারই পা হড়কায়। লোকটা গাছের মগডাল থেকেই চেঁচাচ্ছে সাহায্যের জন্যে। গাছের নিচে সাহায্য করার জন্যে অনেক লোক জড়ো হলেও কেউ বুঝতে পারছেনা যে লোকটাকে কিভাবে মগডাল থেকে নামিয়ে আনা যায়। কিছু না করতে পেরে সবাই হাঁ করে মগডালে আটকে থাকা লোকটার দিকে চেয়ে আছে।
এমন সময়ে সেই গাছের তলা দিয়ে মোল্লা যাচ্ছিলেন। ভিড় দেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন। মোল্লাকে এবার সবাই সাহায্যের জন্যে ধরল। মোল্লা শান্ত মাথায় বললেন, “ঠিক আছে, আমাকে বিশ্বাস করতে বল ওই আটকে থাকা লোককে। আমি ওকে নামিয়ে আনছি।
নাসিরুদ্দিন লম্বা একটা মোটা দড়ি আনিয়ে সেটা মগডালে আটকে থাকা লোকটার কোমরে বেঁধে নিতে বলল। গাছের ডালে বসা লোকটা মোল্লাকে বিশ্বাস করে মোটা দড়িটা নিজের কোমরে কষে বেঁধে নিল। আশেপাশের লোক কৌতূহলী হয়ে মোল্লাকে দেখছিল। মোল্লা বলল, “আমার ওপর বিশ্বাস রাখো। এইরকম ভাবে আমি একটা লোককে আগেও বাঁচিয়েছি।
লোকটার কোমরে দড়ি বাঁধা হয়ে গেলে নাসিরুদ্দিন নিচের দড়িটা ধরে হ্যাঁচকা টান মারতেই লোকটা মগডাল থেকে একেবারে ধপ করে মাটিতে এসে পড়ল। বেশ খানিকটা চোট পেল। এইসব কান্ড দেখে দাঁড়িয়ে থাকা লোকেরা বলল, “মোল্লা, এর চেয়ে ভাল কোন উপায় ছিলনা নাকি!”
নাসিরুদ্দিন বললেন, “হুম, এর আগে কোমরে দড়ি বাঁধিয়ে লোক উদ্ধার করেছিলাম তবে আমার ঠিক খেয়ালে আসছেনা সেবার মানুষটা কুয়োর মধ্যে আটকেছিল না গাছের ডালে।”
মোল্লার উপকারী বন্ধু
মোল্লা একবার রাস্তার ধারের এক জল ধরে রাখার গর্তে পড়ে গেলেন। গর্ত থেকে নাসিরুদ্দিনকে টেনে তুলে উদ্ধার করেছিলেন তাঁরই এক বিশেষ বন্ধু। তারপর থেকে সেই বন্ধু কথায় কথায় নাসিরুদ্দিনকে তার উপকারের কথা মনে করাতে থাকে। দেখা হলেই সেদিনকার গল্প ফেঁদে কিভাবে মোল্লাকে টেনে তুলল আর না তুললেই বা কি হত সেই নিয়ে মোল্লাকে রোজ একই কথা শুনতে হত বলে মোল্লা রীতিমতো বিরক্ত হচ্ছিল।
এইরকম ভাবে কয়েকমাস কাটার পর নাসিরুদ্দিন সেদিনকার মতোই জামাকাপড় পরে তাঁর সেই উপকারী বন্ধুকে নিয়ে আবার সেই জল রাখার গর্তের ধারে গিয়ে ইচ্ছে করেই জলে পড়ে গিয়ে বললেন, “ভায়া সেদিন তুমি যদি আমাকে না তুলতে তাহলে এই যে আজ এখন আমি যেমন আছি সেদিন আমি তেমনি থাকতাম। এবার দয়া করে আর সেই দিনটার কথা মনে করাবেন না। আমার ঠিক মনে আছে।”
গাধার চাঁটি
একদিন রুটির দোকানে দাঁড়িয়ে মোল্লা রুটি কিনছেন। এমন সময়ে পেছন থেকে একটা গাধা মোল্লার পাছায় এক লাথি কষিয়ে পালিয়ে গেল। মোল্লা মুখ থুবড়ে পড়ে হাত ভেঙে দুমাস বাড়িতে বসেই কাটালেন।
ভাল হয়ে ওঠার পর মোল্লা সেই গাধাটাকে খুঁজতে শুরু করলেন। একদিন পেয়েও গেলেন। গাধার মালিক গাছের তলায় ঘুমোচ্ছে আর সেই বজ্জাত গাধাটা ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছে। মোল্লা তো তক্কে তক্কেই ছিলেন। ডান্ডা দিয়ে গাধাটাকে পেটাতে শুরু করলেন। গাধাটা ডেকে উঠল। গাধার ডাক শুনে মালিকের ঘুম গেল চটকে। মালিক মোল্লার দিকে তেড়ে এসে বলল্ম “কি ব্যাপার মোল্লা, তুমি আমার গাধার গায়ে হাত দিলে কেন?”
মোল্লা পেটাতে পেটাতেই বলল, “কেন পেটাচ্ছি তা একমাত্র ও জানে আর আমি জানি। এটা আমার আর ওর ব্যাপার। এর মধ্যে তুমি ঢুকতে যেওনা।”
এবার দার্শনিকই গাধার বাচ্চা
একবার এক দার্শনিকের সঙ্গে মোল্লার রাস্তায় পরিচয় হয়ে গেল। মোল্লার সঙ্গে দর্শনশাস্ত্র চর্চা করার জন্যে দার্শনিক দিনক্ষণ ঠিক করে ফেললেন। এরপর পূর্ব পরিকল্পিত দিন অনুযায়ী দার্শনিক মোল্লার বাড়ি পৌঁছে গেলেন। মোল্লার বাড়ি তালা ঝুলতে দেখে দার্শনিক বেজায় খাপ্পা হয়ে দরজাতে লিখে এলেন – গাধার বাচ্চা।
মোল্লা বাড়ি এসে দরজায় এই লেখা দেখে দৌড়োলেন সেই দার্শনিকের আস্তানায়। দার্শনিককে বাড়িতে পেয়ে মোল্লা বললেন, “আমি দুঃখিত যে আপনি আমার বাড়ি গিয়ে ফিরে চলে এসেছেন। এর জন্যে আমি ক্ষমা চাইছি।”
দার্শনিক খুশি হয়ে বললেন, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমি তোমাকে এ যাত্রায় ক্ষমা করে দিলাম। কিন্তু তুমি জানলে কি করে আমি তোমার বাড়ি গিয়েছিলাম। তুমি তো বাড়িতেই ছিলেনা!”
মোল্লা বললেন, “আমি বাড়ি ফিরে দেখলাম দরজায় আপনার নাম লেখা আছে, সেই দেখে বুঝলাম আপনি আপনার নাম লিখে আমাকে জানিয়ে গেছেন যে আপনি এসেছিলেন।”





No comments: